Swift

সোনালী সপ্নের সোনার চর | Part 2

"সোনালী সপ্নের সোনার চর"

সোনালী সপ্নের সোনার চর
সোনালী সপ্নের সোনার চর
দ্বিতীয় পর্বঃ বৈরি প্রকৃতি আর আমরা ৩৪

চরফ্যাশন নেমে আড়মোড়া ভাংগলাম। আর একটা ব্যস্ত দিনের শুরু যে প্রকৃতির কারণে ভন্ডুল হবে কে জানতো। ইনসিয়াল প্ল্যান ছিল চর কুকরি মুকরি, সোনার চর, আন্ডার চর, শীপ চর, ঢাল চর হয়ে ঢাকা ফিরবো। মাদার ন্যাচারের কাছে মানুষ অসহায়৷ চর কচ্ছপিয়া যাওয়ার জন্য লেগুনা আগে ঠিক করা ছিল চড়ে বসলাম।উপকূলে ক্যাম্পিং করার জন্য তাবু আর বাকি মাল সামান ঠেসেঠুসে তিন লেগুনা কানায় কানায় পরিপূর্ণ। গ্রামের মেঠো পথ ধরে দূরন্ত বেগে চলছে লেগুনা। নাস্তা খাবার জন্য যাত্রা বিরতি দিল চর ফ্যাশন বাজার। এর পূর্বে পথের মাঝে দেখে নিলাম এক চিলতে জ্যাকব টাওয়ার। বাজার থেকে আমাদের সাথে জয়েন করলো মিঠু ভাই৷ ভোলার মানুষ, উনি ট্যুরের উত্তেজনায় একদিন আগেই ভোলা এসে গিয়েছেন। গ্রামের হোটেল এত মানুষের চাপ সামাল দেবার জন্য প্রস্তুতি থাকে না। এত বড় কাফেলা দেখে তারা ভিমরি খেয়ে গেল৷ সামাল দিতে হোটেলের ক্রু বাহিনী নেমে গেল। এত দীর্ঘ যাত্রার পর পেটে কিছু দানা পানি পড়লে যা খাই তাই অমৃত্র লাগে। সাধারণ তেল ছাড়া পরোটা, রুটি, ডাল, ভাজি ডিম, মিস্টি দিয়ে সবাই সকালের নাস্তা সেরে নিলাম। এরপর আবার শুরু হল কচ্ছপিয়ার উদ্দ্যেশে যাত্রা। বলে নেওয়া ভাল সাগরের তিন নাম্বার বিপদ সংকেতের দরুণ আমাদের প্ল্যানিং এর অনেক কাট ছাট করে চর কুকরি মুকরি দিকে প্রথম দিন টার্ন নেয়। আবহাওয়া দেখে অন স্পট সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে লিডার বললেন। এই ধরনের ইভেন্টে অন স্পট ডিসিসন নেবার ক্ষেত্রে আয়োজকদের এসিড টেস্টের ভিতর দিয়ে যেতে হয়৷ সেই দরূন হয় একের পর এক মিস ম্যানেজমেন্ট। সেই মিস ম্যানেজমেন্ট কে হাইলাইটস না করে গল্প আগানোই হবে উত্তম। 

সোনালী সপ্নের সোনার চর
সোনালী সপ্নের সোনার চর
প্রায় দেড়ঘন্টা লেগুনায় অতিবাহিত করার পর এসে পড়লাম আমাদের কাংখিত কচ্ছপিয়া ঘাট৷ কোমড় বাকা অনুভূতি নিয়ে নেমে জানতে পারলাম আমাদের রিজার্ভ করা ট্রলার নদী উত্তাল থাকায় বন্ধুর পথ পাড়ি দিয়ে চর মন্তাজ থেকে কচ্ছপিয়া আসার চেস্টা করে নাই। লাইনের ট্রলারের জন্য বসে থাকতে হবে সাড়ে বারটা পর্যন্ত৷ ট্যুরে এসে অপেক্ষা এই যাতনা যে সয় না। শুয়ে বসে হেটে দুলে গল্পের মাঝে কি ভাবে যেন পারি হয়ে গেল ২ ঘন্টা। আস্তে আস্তে ট্যুরমেটদের সাথে পরিচিত হতে লাগলাম। ফান্টা হুজুর আরিফ ভাই তার কেরামতির মাঝে আসর মাতিয়ে রাখলো। একে একে কথা হল জহির, শহিদুল, শুভ, রাশিক, রঞ্জু, আলামিন, জিয়া ভাই সহ আরও অনেক মানুষের সাথে। সৈকত ভাই এর বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করলাম উনি বিরক্ত হলে বসে থাকেন। আর মামুন ভাই ছবি তুলে বিরক্তি হাল্কার উপর ঝাপসা কমানোর চেস্টা করেন। আল্টিমেটলি শব্দ বোমা মেরে বিরক্তি কমান। এত বৈচিত্র্যময় সংগীদের মাঝে নিজেকে বন্দী ভাবা ভারি অন্যায়৷ কি অদ্ভূত ব্যাপার ২৪ ঘন্টা আগেও যাদের চিনতাম না জানতাম না তাদের কত আপন মনে হচ্ছে৷ দীর্ঘ প্রতিক্ষার অবসান ঘটিয়ে চালু হল আমাদের লাইনের ট্রলার। গন্তব্য চর কুকরি মুকরি। 

সোনালী সপ্নের সোনার চর
সোনালী সপ্নের সোনার চর
জলের রাশি কেটে কেটে যাচ্ছে আমাদের ট্রলার। মেঘনার বিশালতা আগে এত গভীর ভাবে অনুভব করি নাই৷ মেঘনার শাখা নদী তেতুলিয়ায় যদি হয় এত স্রোত৷ মূল মেঘনায় না জানি পানি কি রকম উথাল পাথাল করছে৷ ট্রলার নদীর তেতুলিয়ার মাঝ বুক বরাবর চলছে। কাকফাঁটা রোদে চাঁদিতে আগুন ধরে যাচ্ছে৷ সূর্য মধ্য গগণে এর মাঝে কি প্রকৃতি উপভোগ করা যায়৷ তবে যাযাবর সব পরিস্থিতিতে প্রকৃতির মাঝে মিশে যায়৷ মাথার উপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছে নাম না জানা অচেনা পাখি। চারদিকে বিস্তর সবুজের প্রান্তর৷ আশেপাশে গ্রাম পার হয়ে যাচ্ছে আমাদের জল ময়ূরী। চোখে মেলে দেখতে পেলাম গরুর পাল চরে বেড়াচ্ছে এই সবুজের মাঝে। জলপুত্ররা উত্তাল নদীতে ভাসিয়েছে মাছ ধরার ট্রলার৷ তেতুলিয়া বুক বেয়ে মেঘনার মোহনা পাড়ি দিয়ে গন্তব্য তাদের সাগর৷ এই রকম মোহনীয় পরিবেশের মাঝে একটু দূরে চেয়ে দেখলাম তেপান্তরে দেখা যাচ্ছে ঘন জংগলের আহবান। এক আশ্চর্য রকমের সম্মোহক জগৎ যেন চুম্বকের মত আর্কষন করছে৷ আস্তে আস্তে তার সাথে আমাদের দূরত্ব কমছে। যখন একবারে কাছে এসে গেলাম দেখতে পেলাম দুই পাশের গাছের সারির বুকে চিড়ে বের হয়ে গেছে একটা ক্যানেল৷ তেতুলিয়া নদী থেকে আমরা ঢুকে গেলাম ক্যানেলের ভিতর৷ প্রবেশ করলাম যেন এক চিলতে বুনো সপ্নের মাঝে৷ ট্রলার চলছে ক্যানেলের ভিতর দিয়ে৷ নাম না জানা অসংখ্য গাছ পার করে যাচ্ছে। পিনপতন নিরবতার মাঝে সম্মোহিত কিছু অভিযাত্রী বুনেছে সপ্নের জাল৷ এ যেন সপ্নের ভিতর আর এক সপ্নের রাজ্য। তবে আকাশের মেঘের ঘনরাজ্য দেখে দুর্যোগের ঘনঘটা যে তেড়ে যে আসছে বুঝতে পারলাম। 

সোনালী সপ্নের সোনার চর
সোনালী সপ্নের সোনার চর
মামুন ভাই ছবি তুলতে তুলতে ক্লান্ত অবশান্ত হয়ে বসেছে। এর মাঝেই শুরু হয়ে গেল ঝুম বৃষ্টি৷ পাগলা হাওয়ার তোরে ছাতা খুলেও লাভ হচ্ছে না৷ জাহান, জাকারিয়া, টিটু, আফিফ আমাদের আয়োজক কমিটির সদস্যদের একটা ধন্যবাদ প্রাপ্য। উপকূলের ৩-৪ এর মাঝে উনারা এনেছে বিশাল বড় সাইজের সাদা প্ল্যাস্টিক ক্লথ৷ মানব সেতু করে আমরা ৩৪ জনের কাফেলা নিজেদের ঢেকে ফেললাম প্লাস্টিকের ক্লথ এর আবরণে৷ বৃষ্টির মাঝে গালাগালির তুবড়ি ছুটিয়ে কি লাভ। বর্ষন যখন হবেই উপভোগ করাই শ্রেয়। কতক্ষন এভাবে পার হল জানি না। কিছুক্ষনের মাঝে শুনতে পেলাম আমরা চর কুকরি মুকরি ঘাটের কাছাকাছি চলে এসেছি। বৃষ্টিও ঝিরিঝিরি নৃত্য তুলে প্ল্যাস্টিক ক্লথে রিনিঝিনি সুর তুলেছে। ক্যাম্পিং করতে এসে তো আর কমপ্লিন মানায় না৷ প্রতিকূলতার সাথে লড়াই করে সারভাইভ করার নামই ক্যাম্পিং। ঝিরিঝিরি বৃষ্টির মাঝে ঘাটে নেমে হাল্কা জিরিয়ে হাটা শুরু করলাম। বৃষ্টিও যেন আমাদের সাথে শুরু করেছে লুকোচুরি লুকোচুরি গল্প তারপর হাতছানি অল্প। কখনও কমে কখনও বাড়ে৷ নারিকেল বাগানের ক্যাম্পিং এর মায়রে বাপ হবার শেষ মুহূর্তে আছি আমরা। ঘড়িতে বাজে ২.৩০। হেটে হেটে যাচ্ছি আমরা এই বৃষ্টি কে সংগী করে এক অজানা পথে। লিডার যাচ্ছে আগে তার পিছে পুরা কাফেলা৷ ১০ মিনিট হাটার পর জেলা পরিষদের ডাক বাংলোর সামনে এসে থামলাম৷ বেশ চমৎকার ডাক বাংলো। আপাতত কাক ভেজা হবার চেয়ে এখানে শেল্টার নেওয়া হবে বুদ্ধিমানের কাজ। সৈকত ভাই মাটির মানুষ। মাটির মধ্যে ব্যাগ রেখে মাথা এলিয়ে শুয়ে পড়লো। মনে পড়ে গেল পাহাড়ের স্মৃতি৷ আহারে এভাবেই তো ক্লান্ত হয়ে মাটি কে বিছানা বানিয়ে শুয়ে পড়তাম আমরা। আজ এই প্রতিকূলতার মাঝে সেই স্মৃতি আবার কুড়েকুড়ে খাচ্ছে।


সোনালী সপ্নের সোনার চর
সোনালী সপ্নের সোনার চর
স্থানীয় চেয়ারম্যানের সাথে কথা বলে আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম আপাতত আমরা ইউনিয়ন পরিষদ হাসপাতালের নিচে তাবু পিচ করবো। প্রকৃতি আজ নারিকেল বাগানে তাবু পিচে বাধ সাধলো। বৈরী আবহাওয়া এর মধ্যে কিছু তাবু আছে শুধু শুষ্ক মৌসুমের সাথী। বৃষ্টি থামতে থামতে ঘড়ির কাটায় বিকাল ৪টা। পেটে ছুছো দৌড়াচ্ছে৷ কুকরি বাজারে হানিফ হোটেল আমাদের দু'টা ডাল ভাতের ব্যবস্থা হল। ডাক বাংলো থেকে বের হয়ে হাটা ধরলাম বাজারের পথে। হানিফ হোটেল বসে দেশ, রাজনীতি, অর্থনীতি, পররাষ্ট্রনীতি থেকে আলাপ রসিয়ে রসিয়ে প্রেম-নারী-যৌনতার দিকে ঘুরে গেলেও ডাল ভাত আসে না। এত লোক হুটহাট এসে পড়ায় নতুন করে রান্না চড়িয়েছে৷ দীর্ঘ এক ঘন্টার পর টেবিলে যখন খাবার আসলো ম ম গন্ধে প্রাণটা জুড়িয়ে গেল। সামান্য আয়োজন আলু সহ ডিম ভুনা, মুসরের ডাল আর ভাত৷ খাওয়া শুরু করলাম, আহা কি রান্না৷ সামান্য আয়োজন বার্বুচীর হাতের ছোয়ায় হয়ে গেছে আসামান্য। ভুনা ডিমের সাথে আলু দেবার আগে তেলে ভেজে নিয়েছে৷ মসুরের ডালে সাথে হাল্কা বোম্বাই মরিচ মিশিয়েছে সাথে মোটা চালের ভাত৷ এক কথায় তোফা৷ মুখে এখনও যেন স্বাদ লেগে আছে৷ খাওয়ার পর্ব সেরে ইউনিয়ন পরিষদ হাসপাতাল পৌচ্ছাতে পৌচ্ছাতে সন্ধ্যা হয়ে গেল৷ চার তলা হাসপাতালের নিচ তলা একেবারে ফাঁকা। বৃষ্টি হলেও ভিজতে হবে না৷ আলো আধারীর মাঝে কোন রকম পিচ করলাম আমাদের তাবু৷ ব্যস্ত দিন শেষে ক্লান্তিতে ঢলে গেলাম তাবুর ভিতরে৷ একটু রেস্ট নিয়ে রাতের খাবারের সময় হয়ে গেল। আবার সেই হানিফ হোটেল৷ এবার ভাত, ডাল সাথে ইলিশ মাছ৷ উদরপূর্তি করে ফিরে এলাম নিজ নিড়ে৷ এবার শান্তির ঘুম। তবে মাঝ রাতে যারা জেগে ছিল তারা টের পেয়েছে অদ্ভুত সব নসিকা গর্জন। আসেপাশে কোন ভয়ানক জন্তু জানোয়ার জ্বীন ভূত থাকলে অবশ্যই এই ডাকের ভয়ে পালাতো চর ছেড়ে বহুদূরে৷ 

Part 1

You Might Also Like

0 comments

Flickr Images