Country
Places
Travel Guides
Trip Ideas
Kashmir The Heaven On Earth | Travel Guides | কাশ্মীর | Part 2
কাশ্মীর (বা কাশ্মীর ভ্যালি) একটা গামলার মতো
জায়গা। চারদিকে তুষারাবৃত পশ্চিম হিমালয়ের শ্বেতশুভ্র চূড়া, আর মাঝখানের
জায়গাটুকু, যেটা সমুদ্র সমতল হতে প্রায় ৫০০০ ফিটের মতো উঁচুতে অবস্থিত,
মোটামোটি সমতল, যাকে বলে কাশ্মীর ভ্যালি। তাই কাশ্মীর ভ্যালির যেখানেই আপনি
যান, আপনাকে মোটামোটি সবসময় সুন্দর সুন্দর পাহাড় গুলো কমবেশি ঘিরেই থাকবে।
ভৌগোলিক ভাবে এটি ভারতের সর্ব উত্তরের রাজ্য। ভারতের অন্তর্গত কাশ্মীর
আসলে বৃহত্তর কাশ্মীরের একটি অংশ বিশেষ, বৃহত্তর কাশ্মিরের আরেকটা অংশ
(প্রায় ৩ ভাগের এক ভাগ) পাকিস্তানে , যাকে বলে "আজাদ কাশ্মীর". বৃহত্তর
কাশ্মীরের একটা অংশ (পূর্বদিকে, লাদাখের সীমানায়) আবার চায়নার নিয়ন্ত্রণে
আছে। প্রায় ৯০ শতাংশ মুসলিম অধ্যুষিত কাশ্মীর এক সময় বৌদ্ধ অধ্যুষিত ছিল।
পরবর্তীতে প্রায় ৪০০ বছরের মুসলিম শাসনামলে কাশ্মীরে মুসলিমরা সংখ্যাগরিষ্ঠ
হয়ে ওঠে। তাই কাশ্মীরের রাজধানী শ্রীনগরে মুঘলদের সময়কার অনেক স্থাপত্য
এখনো দেখা যায়।
কাশ্মীরের ইতিহাস অনেকটা নিপীড়ণের ইতিহাস। ৪০০
বছরের মুসলিম শাসনামলের শুরুর দিকে মুঘলদের সময় পরিস্থিতি ভালো হলেও
পরবর্তীতে আফগানদের শাসনামলে দমন-পীড়ন শুরু হয়। এরপর শিখরা ক্ষমতায় এলে
কয়েক ধাপ বেড়ে যায় নিগ্রহের পরিমান। নিষিদ্ধ করা হয় আজান, গবাদিপশু জবাই
কে বেআইনি করা হয়, বহু মসজিদ ধ্বংস করা হয়, তরবারির মুখে মুসলিম দের সব
ধরণের অত্যাচার করা হয়, এবং অনেক বেশি খাজনা নিয়ে কাশ্মীরকে ভারতীয়
উপমহাদেশের সবচেয়ে বেশি খাজনা সংগ্রহকারী রাজ্যে পরিণত করা হয়। এরপরে আসে
ব্রিটিশ শাসন যে ইতিহাস কম বেশি সবার ই জানা।
১৯৪৭ সালে ভারত
বিভাগের সময় ব্রিটিশরা কাশ্মীর এবং এর সীমানা নিয়ে একটা দুর্বল পরিকল্পনা
করে। কাশ্মীরকে ফ্লেক্সিবিলিটি দেয়া হয় সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য যে তারা
ভারতের সাথে থাকবে, নাকি পাকিস্তানের সাথে থাকবে, নাকি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠন
করবে। হারি সিং, তৎকালীন কাশ্মীরের মহারাজা, চিন্তা করলেন যে সময়ক্ষেপণের
মাধ্যমে তিনি কাশ্মীরকে ধীরে ধীরে স্বাধীন রাষ্ট্রের দিকে নিয়ে যাবেন, মানে
হলো না পাকিস্তান না ভারত। এর মধ্যেই কাশ্মীরে পশতুন বিদ্রোহীদের আক্রমণ
শুরু হলে হারি সিং ভারতের শরণাপন্ন হলেন, এই সুযোগে ভারত চুক্তি করে নিলো
যে সাহায্যের বিনিময়ে কাশ্মীরকে তাদের সাথে থাকতে হবে, এবং এ প্রস্তাবে
হারি সিং রাজি হলেন। কিন্তু পাকিস্তান ভাবলো, মুসলিম অধ্যুষিত কাশ্মীরকে
যৌক্তিকভাবেই পাকিস্তানের সাথে থাকা উচিত যেমনটা বাংলাদেশ ছিল। শুরু হলো
ভারত পাকিস্তান যুদ্ধ। এমতাবস্থায় ১৯৪৯ সালে পাকিস্তানের মাঝখানে একটি লাইন
বরাবর যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করা হলো জাতিসংঘের মধ্যস্থতায়, যেটাকে বলে "লাইন
অফ কন্ট্রোল", যা কাশ্মীরকে ভারত কাশ্মীর এবং আজাদ কাশ্মীরে বিভক্ত করে
ফেললো। আজাদ কাশ্মীর মুসলিম অধ্যুষিত হলেও ভৌগোলিক ভাবে দুর্গম এবং
অর্থনৈতিক ভাবে দুর্বল, এবং জনসংখ্যাও কম। ভারত কাশ্মীরও মুসলিম অধ্যুষিত,
কিন্তু ভৌগোলিক এবং অর্থনৈতিক দিক থেকে তুলনামূলক ভাবে সমৃদ্ধ এবং
জনসংখ্যাও বেশি।
কাশ্মীরিরা সেই থেকে স্বাধীনতা চেয়ে আসছে, ভারত
বলেছে যে "শান্তি ফিরে আশা মাত্র কাশ্মীরকে তারা স্বাধীনতা দেয়ার ব্যাপারে
চিন্তাভাবনা শুরু হবে", আর একটা একটা চাল মাত্র। ভারত পাকিস্তান দুই দেশ ই
বিভিন্ন কৌশলে অশান্তি জিইয়ে রেখেছে ভূ -স্বর্গে, যাতে স্বাধীনতার প্রসঙ্গ
টি টেবিলে না আসে।
ভাবছেন কেন বললাম এ কথা গুলো, তাই না? আসলে
কাশ্মীরের যতটুকু সৌন্দর্য তার প্রকৃতিতে, তার চেয়ে বেশি সৌন্দর্য এর
মানুষগুলোর মধ্যে। পরাধীনতার আর নিগ্রহের এই ব্যাথা প্রতিটা কাশ্মীরির
বুকের একটা কমন হাহাকার। তাদের যৌক্তিক ক্ষোভ, ভারতীয় মিডিয়া কাশ্মীরকে যা
বানিয়ে রেখেছে, তা সত্যের চেয়ে অনেক দূরে। তাদের নিজের জায়গায় ভারতীয়
সৈন্যরা অত্যাচার/নির্যাতন করে, বহিরাগত সৈন্যদের কাছে নিবাসী কাশ্মীরিদের
জিম্মি হয়ে থাকতে হয়। কাশ্মীরিদের ভারতের অন্যান্য রাজ্যের লোকেরা নিচু
চোখে দেখে, চাকরি পাওয়া যায় না, উচ্চ শিক্ষিত যুবকরা ঘোড়ার সওয়ার টানে,
উচ্চ শিক্ষিত মেয়েরা গৃহবধূ হয়ে জীবন কাটিয়ে দেয়। এমনকি পার্শবর্তী রাজ্যে
তাদেরকে হোটেলে প্রবেশের অনুমতি দেয়া হয় না সন্ত্রাসী সন্দেহে। অথচ আপনি
যখন তাদের কাছে কোনো সাহায্য চাইবেন (একটা রোড ডিরেকশন, কোনো প্রশ্ন), ওরা
আপনাকে প্রাণ দিয়ে সহায়তা করবে। বাংলাদেশী শুনলে আপনাকে কিভাবে হেল্প করবে
তা বুঝে কুলাতে পারবে না। ওরা কোহলি - ধাওয়ান দের চেয়ে
মুশফিক-শাকিব-মাশরাফি বলতে পাগল। বাংলাদেশ-ভারত এশিয়া কাপ খেলার সময় পুরো
শ্রীনগরের মানুষ বাংলাদেশের সাপোর্ট করছিলো, এই দৃশ্য এবং এই ভালোবাসার
কারণটা উপলব্ধি করা যায় না যদি আপনি এই অসাধারণ মানুষগুলোকে এবং তার
ইতিহাসকে না জানেন।
ইতিহাসের এবং ব্যাকগ্রউন্ডের পালা শেষ। এবার
ফিরে যাই ভ্রমণ সংক্রান্ত তথ্যে। কাশ্মীরের মূল শহর দুটি, জম্মু, এবং
শ্রীনগর। জম্মু মূলত হিন্দু অধ্যুষিত, শ্রীনগর মুসলিম। সাধারণত ওরা
কাশ্মীরি ভাষাতেই কথা বলে নিজেদের মধ্যে, আর টুরিস্টদের সাথে ব্যবহার করে
হিন্দি অথবা উর্দু। টুরিজম কাশ্মীরের অন্যতম প্রধান আয়ের উৎস, এটা হাজার
হাজার কাশ্মীরির জীবন ধরণের মূল উপায়। তাই কাশ্মীরের টুরিস্ট স্পট গুলোতে
আপনি অনেক ঘোড়াওয়ালা এবং গাইড দেখবেন। ওরা হয়তো আপনার পেছনে লেগে থাকবে,
ওদের সার্ভিস নেয়ার জন্য। কিন্তু কেউ আপনাকে জোড় করবে না। সুতরাং ওদের
সাথে রাগ না করে আলগোছে এগিয়ে চলুন আপনার গন্তব্যে।
কাশ্মীরের সব
চেয়ে পপুলার টুরিস্ট স্পট গুলো হলো শ্রীনগর, পেহেলগাম, গুলমার্গ, এবং
সোনামার্গ। অফ দি বিটেন ট্র্যাক, অথবা যাকে বলা হয় সাধারণ টুরিস্টদের
দূরবীনের বাইরে যে অনিন্দ সুন্দর জায়গা গুলো রয়েছে সেগুলো হলো ইউসমার্গ,
আরু ভ্যালি, দুধপাথরি, লোলাব ভ্যালি, গুৱেজ ভ্যালি, কার্গিল, চাতপাল,
ইত্যাদি। যেখানে আপনার আর প্রকৃতির মাঝের রোমান্সে কেউ একটুও ভাগ বসাতে
আসবে না। পরবর্তী পর্ব গুলোতে যতটুকু সম্ভব এই জায়গা গুলো দেখার ব্যাপারে
বিস্তারিত আলোচনা করা হবে।
কাশ্মীর আপনাকে শুধুমাত্র দৃশ্য দেবে না, দিবে এক আটি স্মৃতি, অবসরের কোনো এক মুহূর্তে যা আপনাকে ভরিয়ে দিবে এক রাশ ভালো লাগায়।




0 comments