পেহেলগাম দক্ষিণ কাশ্মীরের, ঠিক দক্ষিণ বলা যাবে
না, দক্ষিণ-পূর্ব কাশ্মীরের ছোট্ট এক টুকরো স্বর্গ। চারদিকে সবুজ রঙা
সুউচ্চ পাহাড়, মাঝখানে নুপুর পড়া পায়ে ছলাৎ ছলাৎ শব্দে এঁকে বেঁকে চলে
গিয়েছে বরফ গলা সবুজ রঙা নদী "লিডার", যার জন্ম খানিকটা উত্তরে "কোলাহই"
গ্লেসিয়ারে। জন্মের পর এ নদীর জীবন ৭৩ কিলোমিটার, কিন্তু এই
স্বল্পদৈর্ঘ্যের জীবনে সে যে রূপ তার অঙ্গে ধারণ করেছে সেটা না দেখলে বোঝা
সম্ভব না। শুধুমাত্র এই রূপসী নদীটি দেখার জন্য হলেও পেহেলগাম যাওয়া
সার্থক। খুব ইচ্ছা হচ্ছিল নদীর পাড়ে একটা রাত তাবু গেড়ে থাকি, সারা রাত
একটি শব্দও না করে শুনে যাই এই কঙ্কন কন্যার গান। কিন্তু হয়ে উঠেনি
আবহাওয়া কিছুটা ভেজা থাকার কারণে। তবে এটা আমি করেই ছাড়ব, sooner, or
later.
আপনি
যদি শ্রীনগর থেকে পেহেলগাম আসতে চান, তাহলে দুটি উপায়। এক হলো সরাসরি
প্রাইভেট ট্যাক্সি অথবা জিপ নিয়ে নেয়া। খরচ পড়বে ২০০০-৩০০০ রুপির মতো, সময়
লাগবে ২.৫-৩ ঘন্টা। আরেকটি হলো শ্রীনগরের লাল চৌক থেকে শেয়ারড জিপে
অনন্তনাগ যাওয়া, ভাড়া ৮০ রুপি, তারপর অনন্তনাগ থেকে পেহেলগাম আরো ৮০ রুপি।
অনন্তনাগের মূল ট্যাক্সি স্ট্যান্ড থেকে শেয়ার্ড জিপ ছেড়ে যায়। যে জিপে
শ্রীনগর থেকে আসবেন, সেই ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করুন, সে-ই দেখিয়ে দিবে।
যদি শ্রীনগর এয়ারপোর্ট থেকে সরাসরি যেতে চান, তাহলে এয়ারপোর্ট থেকে
ট্যাক্সি নিয়ে অনন্তনাগ চলে যান, ভাড়া পর্বে ১৭০০ রুপি। সেখান থেকে
শেয়ার্ড এ যেতে পারেন। আর যদি সরাসরি পেহেলগাম যেতে চান ট্যাক্সি নিয়ে
তাহলে ২৮০০ রুপি পড়বে।
অনন্তনাগ থেকে যে জিপে যাবেন, পারলে বামের
দিকের সিটে বসুন। কারণ যেখান থেকে পেহেলগামের পাহাড়গুলো শুরু হবে, সেখান
থেকেই শুরু হবে লিডার নদী, রাস্তার সমান্তরালে, হাতের বামপাশে। হাতের
ক্যামেরা টা রেডি রাখুন, হটাৎ হটাৎ করে অনেক মুহূর্ত পেয়ে যাবেন শাটার-এ ঝড়
তোলার জন্য। আর লিডারের সৌন্দর্যে যখন বুঁদ হয়ে আছেন, তখন ভুলে গেলে
চলবেনা যে রাস্তার ডানদিকে একটু একটু করে বরফঢাকা পাহাড়গুলো তাদের মাথা
তুলে আপনাকে অভ্যর্থনা জানাচ্ছে। ওদিকেও একটু খেয়াল রাখুন।
পেহেলগাম যখন পৌঁছাবেন, তখন আপনাকে মোটামোটি জেঁকে ধরবে ঘোড়া আর গাড়ি
অলারা। কেউ আপনাকে নিয়ে যেতে চাইবে "মিনি সুইজারল্যান্ড" খ্যাত বাইসারণ,
কেউ চাইবে নিতে অরু (কাশ্মীরিরা ডাকে "আড়ু") ভ্যালি, কেউ বা বেতাব ভ্যালি।
যদি আপনি শেয়ারড জিপে এসে থাকেন তাহলে জিপের ড্রাইভার ই ইচ্ছাকৃত বা
অনিচ্ছাকৃত ভাবে নিঃশব্দে আপনাকে ঘোড়া অথবা গাড়ি অলাদের হাতে তুলে দিবে।
কিন্তু ভয়ের কিছু নেই। শক্ত থাকুন, মুখে হাসি ধরে রাখুন, আর বলুন যে আপনি
কোথাও যাবেন না। বলে সবার মনোযোগ উপেক্ষা করে হেটে হেটে ট্যাক্সি স্টেশন
-২ এর কাছে চলে যান। ওখানে কয়েকটা রেস্টুরেন্ট আছে, ব্যাগ রেখে হাত মুখ
ধুয়ে এক কাপ মজাদার কাশ্মীরি কেহওয়া খেয়ে নিন। ক্লান্তি আর ঘোড়া/গাড়ি
অলাদের ধকল কেটে যাবে। এর পর প্ল্যান করুন (যদি অলরেডি করা না থাকে) যে এর
পরে কোথায় যাবেন। পারলে ওখানে হোটেল প্যালেস্টাইন এর নিচের রেস্টুরেন্টে
চলে যান, আলী চাচা আছেন, অনেক মমতা করে কথা বলেন এবং খাওয়ান। বয়স্ক লোক,
সুন্দর করে সালাম দিন, উনার আতিথেয়তা ভোলার মতো না। রেস্টুরেন্টে চাইলে
ওয়াইফাই ও ব্যবহার করতে পারেন।
পেহেলগামে যেখানে আপনাকে
শেয়ার্ড জিপি থেকে নামাবে, তার ঠিক বামেই আছে একটা অনিন্দ সুন্দর মসজিদ।
পাহাড়ের সামনে নদীর পাড়ে খুব সাধারণ এই মসজিদটি এক কথায় ছবির মতো সুন্দর।
পারলে একটু ঘুরে আসুন, নামাজও পড়তে পারেন যদি মুসলিম হন, একটা শান্তি অনুভব
করবেন যেটা ঠিক প্রকাশ করা যায় না। একটা দুইটা ছবিও তুলে নিন। মসজিদ তো
অনেক পাবেন, এরকম রং তুলিতে আঁকা মসজিদ পাওয়া একটু কঠিনই হবে বৈকি।
পেহেলগামের উত্তরে, লিডার নদীর পাড় ধরে প্রায় ১৩ কিলোমিটার দূরে গেলে
পাবেন ছবির মতো সুন্দর ছোট একটি গ্রাম, আরু ভ্যালি। যখন রোড ধরে যাবেন,
হটাৎ উল্টো দিক থেকে ছুটে আসবে কেশর দোলানো এক পাল মুক্ত ঘোড়া, একদম
স্বপ্নের মতো। অথবা ধীর পায়ে চলমান কার্পেটের মতো এগিয়ে আসবে এক পাল ভেড়া।
বা দিকে রূপসী লিডার বয়ে চলেছে গাছপালা আর পাথরের ফাঁকে উঁকি দিয়ে দিয়ে।
নদীর ওপারে শুধু পাহাড়, আর তার গায়ে থেকে থেকে মাটি আর কাঠ দিয়ে বানানো
গুজ্জার লোকদের হাট, বিচ্ছিন্ন ভাবে একটা দুটো গরু বা ঘোড়া আপন মনে ঘাস
খেয়ে যাচ্ছে। অপূর্ব সে দৃশ্য।
আরও ভ্যালি তে থাকার মতো অনেক
হোটেল আছে, তবে পেহেলগাম থেকে তুলনামূলক ভাবে উঁচুতে হওয়ায় এর তাপমাত্রা
অনেক কম। অল্প কিছু বাড়িঘর আর কিছু হোটেল নিয়ে গোড়া এ শহরে সবচেয়ে সুন্দর
হোটেল টি হলো সরকারি টুরিস্ট লজ "হোটেল আলপাইন"। পাহাড়ের ঢালে নদীর পাড়
ঘেঁষে অনেকটুকু জায়গা নিয়ে করা এই হোটেলটির চারদিকের ভিউ এক কোথায় স্টানিং।
ভাড়াও তুলনামূলক ভাবে কম। তবে পিক সিজনে গেলে অগ্রিম রিজার্ভেশন করে
যাবেন। না হলে ধরা খাওয়ার সম্ভাবনা আছে। হোটেল সামনের সুন্দর করে সাজানো
বাগানে বসে চা খেতে খেতে জীবনের অন্য রকম কোনো একটা মানে খুঁজে পেলে অবাক
হবার কিছু থাকবে না।
আরু ভ্যালি হাইকিং এর জন্য আদর্শ জায়গা। এখান
থেকে কিছু উপরেই আপনি পাবেন "গ্রিন টপ" যেখান থেকে আরু ভ্যালি, লিডার নদী
এবং এদের ঘিরে রাখা পাহাড়গুলো নিয়ে অসাধারণ ভিউ পাবেন। হেঁটেই উঠা যায়,
কিন্তু ঘোড়া অলারা যন্ত্রনা করবে। সময় নিয়ে যান, রেইন কোট সাথে রাখুন।
এখানে যে কোনো সময় বৃষ্টি চলে আসে।
আরু ভ্যালি থেকে ৩ দিনের
ট্রেকে যাওয়া যায় তারসার লেক, যেটা প্রায় ১১ হাজার ফুট উচ্চতায় একটা আলপাইন
লেক। আরু ভ্যালির হোটেল গুলোই গাইড এবং ঘোড়ার ব্যবস্থা করে দেবে খাবার
এবং অন্যান্য জিনিসপত্র টানার জন্য যদি প্রয়োজন হয়। এছাড়া গ্রামের মাঝখানে
ইকবাল ভাই এর হোটেল আছে, ওখানে খাওয়া দাওয়া করে নিতে পারেন।
পেহেলগাম থেকে আরু ভ্যালি যেতে হলে প্রাইভেট ট্যাক্সি তে যেতে পারেন,
আপ-ডাউন ভাড়া পড়বে ৬০০ রুপি। আর যদি শেয়ারড জিপে যেতে চান, তাহলে
"ট্যাক্সি স্টেশন-২" এর কাছে চলে যান, স্টেশনে ঢোকার রাস্তার মুখেই দেখবেন
একটা গাড়ি দাঁড়ানো আছে, সংক্ষেপে জিজ্ঞেস করুন "আড়ু জায়েঙ্গে?" হ্যাঁ-সূচক
হলে উঠে পড়ুন। ভাড়া ৩০ রুপি। সময় লাগবে ৩০ মিনিটের মতো। রাস্তায় আরু
ভ্যালি থেকে ৫ কিলোমিটার আগে পড়বে "লিডার ভিউ পয়েন্ট", এখন থেকে দেখতে
পাবেন রূপসী লিডারের সবচেয়ে সুন্দর রূপ, অনেক নিচে এঁকে বেঁকে ছুঁটে চলেছে
লিডার, যার যাত্রাপথের অনেক টুকু এই পয়েন্ট থেকে দেখা যায়। ড্রাইভার কে
অনুরোধ করে ১ মিনিটের জন্য গাড়ি থামিয়ে একটা দুটো ছবি তুলে নিন। না হলে
কিন্তু বিরাট লস।
পেহেলগামের কাছেই, প্রায় ৭ কিলোমিটার দূরে
পাহাড়ের উপরে আছে মিনি সুইজারল্যান্ড - খ্যাত বাইসারণ। এই বাইসারণ কে
ঘিরেই ঘোড়া অলাদের যত ব্যবসা। যাওয়ায় রাস্তাটা খুবই সুন্দর। হাইক করার
জন্য রীতিমতো আদর্শ। আমি হাইকিং পছন্দ করি বলে গিয়েছিলাম ও হাইক করেই,
কিন্তু শেষ আধা কিলোমিটার ওরা ঘোড়া দিয়ে রাস্তা টার এমন বারোটা বাজিয়ে
রেখেছে যে, মানসিক ভাবে শক্ত না হলে ওই পথটুকু পাড়ি দেয়া যারপর নাই
ঝামেলার। আমি যেদিন গিয়েছিলাম সেদিন সকালে বৃষ্টি হওয়ায় রীতিমতো ১ ফুটের
মতো গভীর কাদা ছিল। জুতা আর দেখা যাচ্ছিলো না। বৃষ্টি না হলে এমন থাকে
কিনা আমি জানি না, কিন্তু হেটে যাওয়ার জন্য, চারদিকের দৃশ্য দেখার জন্য, আর
নীরবতা উপভোগ করার জন্য আমি শেষ আধা কিলোমিটারের কষ্ট এর পরের বার ও মেনে
নেবো। তবে আপনি ঘোড়া নিয়ে যেতে পারেন। খরচ পড়বে ৫০০-৭০০ রুপি জন প্রতি।
বাইসারান আসলে একটা পাহাড় এবং পাইন গাছে ঘেরা সুন্দর একটা মাঠ। অনেক বড়ো
মাঠ বটে। এখানে আপনি জিপ লাইনিং করতে পারবেন, ক্যাম্পিং করতে পারেন
ওভারনাইট, জর্বিং করতে পারেন, পিকনিক করতে পারেন ফ্যামিলি নিয়ে, বাচ্চাদের
জন্য এতো বড়ো সুন্দর একটা স্পট ওদের জন্য ড্রিম এর মতো। নিশ্চিতভাবেই ওরা
এটা অনেক পছন্দ করবে। হেটে গেলে কমপক্ষে ৬ ঘন্টা সময় নিয়ে যাবেন। আর
সকালের দিকে যাবেন।
পেহেলগামের কাছেই আরেকটা সুন্দর জায়গা আছে,
নাম বেতাব ভ্যালি। হিন্দি সিনেমা বেতাব -এর শুটিং এখানে হয়েছিল বলে এর
এরকম নামকরণ করা হয়েছে। আমি যায়নি এখানে, তাই বলতে পারছি না। আপনি ঘুরে
আসতে পারেন।
এছাড়া পেহেলগাম থেকে আরু ভ্যালির দিকে যাওয়া রাস্তাতে
কিছুদূর গেলেই নদীর পাড় ঘেঁষে অনেক বড়ো একটা পার্ক আছে, ওখানে সুন্দর কিছু
সময় কাটাতে পারেন। তবে এই পার্কে অনেক ভিড় থাকে, সবাই পিকনিক করতে আসে।
যত উত্তরে যাবেন, মানে আরু ভ্যালির দিকে, ততো ভিড় কমতে থাকবে। পার্কে
পৌঁছানোর একটু আগে একটা amusement পার্ক আছে, ওখানেও সময় কাটাতে পারেন।
বাচ্চাদের ভালো লাগবে।
কখন যাবেন : মার্চ থেকে অক্টোবর। এর বাইরে গেলে ঠান্ডা বেশি থাকবে, খুব একটা এনজয় করতে পারবেন বলে মনে হয় না।
কোথায় থাকবেন : শহরের কেন্দ্রে অনেক হোটেল আছে, মিড্ রেঞ্জের। এখানে ১০০০
থেকে ৩০০০ টাকার মধ্যে অনেক ভালো হোটেল পেয়ে যাবেন। টপ এন্ড হোটেল গুলো
শহর থেকে উত্তর দিকে একটু দূরে। বুকিং ডট কম থেকে দেখে নিতে পারেন, অথবা
অন্য কোনো সাইট থেকে। হোটেল প্যালেস্টাইন এও উঠতে পারেন। নিসার ভাই
অমায়িক মানুষ। রুম গুলিও ভালো।
তবে আমার কাছে এখানেও গভর্নমেন্ট এর
কটেজ "আলপাইন টুরিস্ট বাংলো" সবচেয়ে ভালো লেগেছে। পাহাড়ের ঢালে, পুরো
পেহেলগাম ভ্যালি আর দূরে তুষার ঢাকা পাহাড় এখান থেকে দেখা যায়, তবে একটু
শহরের বাইরে এই আর কি।
আজ এই পর্যন্তই। যদি আপনি পেহেলগাম যান,
তাহলে লিডারের পানিতে আমার পক্ষ থেকে একটা ছোট্ট ফুল ছেড়ে দিতে ভুলবেন না।
এই পাহাড়ি কন্যাটিকে আমি অনেক ভালোবাসি। এবং আমি জানি, সে ও।


































