Swift

সৌন্দর্যের দেশ বান্দরবানের আরেক বিস্ময় | বান্দরবান | বাংলাদেশ

সৌন্দর্যের দেশ বান্দরবানের আরেক বিস্ময় | বান্দরবান | বাংলাদেশ
বান্দরবান | বাংলাদেশ
অদ্ভুত সৌন্দর্যের দেশ বান্দরবানের আরেক বিস্ময় - আলীকদম!
নতুন অচেনা কোনো দেশে গেলে মানুষ শিশু বয়সের বিস্মিত হওয়ার মতো অনুভূতিটি ফিরে পায় - বিল ব্রাইসন এর এই কথার ওপর আস্থা রেখে ফেলে আসা কিছু নিষ্পাপ অনুভূতির স্বাদ পেতে বেরিয়ে পড়তে পারেন অদেখা কোনো জায়গায়। আর তা যদি হয় দেশের সবচেয়ে উঁচু রাস্তা ধরে ভয়ংকর সুন্দর দামতুয়া ঝরনা আর ডিম পাহাড়ের আলীকদমে...তাহলে তো সেটা জীবনভর বলে বেড়ানোর মতন এক ভ্রমণ হয়ে থাকবে!
সৌন্দর্যের দেশ বান্দরবানের আরেক বিস্ময় | বান্দরবান | বাংলাদেশ
বান্দরবান | বাংলাদেশ

চট্টগ্রাম থেকে আগের দিন সিদ্ধান্ত নিয়ে আমি আর আমার রুমমেট পরদিন সকালে বেরিয়ে পড়লাম আলীকদমের উদ্দেশে।
আদু মুরং পাড়ায় যখন আমরা পৌঁছলাম তখন এগারোটার কিছু বেশি। এবার গন্তব্য দামতুয়া ঝরনা। ঝরনায় যাবার জন্যে এখান থেকে গাইড নিতে হয়। গাইডের খরচ নির্ধারণ করা আছে এক হাজার টাকা! দুজনের জন্যে এটা অনেক ব্যয়বহুল হয়ে যায়। তবু আমরা নিতে রাজি ছিলাম। কিন্তু আমাদের বাইক রাইডার স্থানীয় একটা গ্রুপের সাথে মিলিয়ে একটা গাইড ঠিক করে দেয়। আদতে আমাদের ভাগে পড়ে তিনশো টাকা।
সৌন্দর্যের দেশ বান্দরবানের আরেক বিস্ময় | বান্দরবান | বাংলাদেশ
বান্দরবান | বাংলাদেশ
পুচকে গাইডকে নিয়ে আমাদের যাত্রা শুরু হল আদু মুরং পাড়া থেকে। সে এক অতিমানবীয় যাত্রা! এই কথা বলছি কারণ এর আগে কখনো এমন প্রায় খাড়া কতগুলো পাহাড় টপকে হাঁটার অভ্যেস ছিলোনা। বড়জোড় সাজেকের রুইলুই পাড়া থেকে চল্লিশ মিনিট ধরে একটানা নামতে নামতে নিচের ঝরনায় পৌঁছেছিলাম৷ সেটাই ছিল দামতুয়া যাবার আগ পর্যন্ত আমাদের দুজনের জন্যেই ট্রেকিং এর একমাত্র অভিজ্ঞতা !
সৌন্দর্যের দেশ বান্দরবানের আরেক বিস্ময় | বান্দরবান | বাংলাদেশ
বান্দরবান | বাংলাদেশ
আর এবার তো সামনে বিশাল বিশাল সব পাহাড়! শরীর দমে গেলেও মনের জোরেই কেবল চলেছি সামনে। তবে শরীর যতই মানা করুক চলতি পথে অপূর্ব সব দৃশ্যাবলি মনের উদ্যম বাড়িয়ে দিয়েছে আরো বহুগুণে। নতুন কিছু দেখার ইচ্ছে প্রবল হলে বহুত কষ্ট নিয়েও সামনে এগিয়ে যাওয়াই একমাত্র উপায়। সেই নতুনের টানেই এগোতে থাকলাম সামনে। পাহাড় বেয়ে হাঁটার সময় অদেখা ঝরনার শব্দে কৌতূহলী মন পায়ের গতি আরো বাড়িয়ে দিতে বাধ্য করেছে বারবার!
তবে গাইড খুব সুবিধার ছিলোনা। বেচারা আমাদের পথ দেখাবে কি, উল্টো নিজেই কখনো পিছিয়ে পড়ছিলো!
পাহাড় টপকিয়ে অনেকটা হাঁটার পর সমতলের দেখা মিললো। এইটা সম্ভবত মেম্বার পাড়া। এই সমতলের পথে একটু পরপরই দেখা মেলে ঝিরিপথের। কড়া রোদে খাড়া পাহাড় বেয়ে এমন শীতল জলের ঝিরির দেখা পেলে মাথা ঠান্ডা না করে থাকা দায়! বেশ সময় নিয়ে সেখানে শীতল জল গায়ে মাখলাম।
সৌন্দর্যের দেশ বান্দরবানের আরেক বিস্ময় | বান্দরবান | বাংলাদেশ
বান্দরবান | বাংলাদেশ

যাওয়ার সময় আদু মুরং পাড়া থেকে কমলা নিয়ে গিয়েছিলাম। পাহাড়ে চড়ার সময় এই কমলা খেতে গিয়ে মনে হল এমন সুস্বাদু কমলা আগে কখনো খাইনি! আসলে পাহাড় চড়ে আর ক্ষুধা তৃষ্ণায় ব্যাপারটা এমন দাঁড়িয়েছে তখন সামনে খাওয়ার যা পেতাম তাই প্রবল গ্রাসে মুখে পুরে দিতাম এবং নির্ঘাত সেটাই আহামরি স্বাদের খাবার মনে হত!
কাখৈ পাড়ার আগের পাহাড় থেকে অদূরের জুমচাষ করা পাহাড়টা দেখে খালি পায়ে পাহাড় ডিঙানোর যন্ত্রণাই যেন ভুলে গিয়েছিলাম৷ ধপ করে বসে পড়ে ওদিকে তাকিয়ে শুধুই সৌন্দর্য গিলছিলাম। এত আশ্চর্য সব মুগ্ধতা এইসব জায়গাজুড়ে! আফসোস হচ্ছিল।সকালে গেলে হয়ত পাহাড়ের গায়ে মেঘ জমে থাকাও দেখতে পারতাম ! সবমিলিয়ে দুই ঘন্টা পনেরো মিনিট ট্রেকিং এর পর দামতুয়া জলপ্রপাতে পৌঁছলাম৷ এই জলপ্রপাতের পানিই শেষমেশ দামতুয়া ঝরনায় পড়েছে। জলপ্রপাতের গা ঘেঁষে দাঁড়ানো প্রায় খাড়া পাহাড় টপকেই দামতুয়া ঝরনা। এই ঐশ্বরিক সৌন্দর্যের কথা লিখে প্রকাশ করার মতন সাধ্য আমার নেই! তবে এটুকু বলে রাখি এত ভয়ানক পরিশ্রমের পর সেখানে পৌঁছে সব কষ্টই যেন নিমিষে ঝরনা জলে ধোয়ে গেছে! জয় করার এক অদ্ভুত আনন্দের ধাক্কাটা সামলে নিতেই ঝাঁপিয়ে পড়লাম পানিতে!
ও হ্যাঁ...দামতুয়া ঝরনার একটা দুর্দান্ত ভিউ পাওয়া যায় ঝরনার আগের ক্যাসকেইডটার (দামতুয়া জলপ্রপাত) ওপরে গিয়ে বাঁদিকে ওঠলে। রোমাঞ্চপ্রিয় মানুষ এই ভিউটা মোটেও মিস করতে চাইবে না! আর ক্যাসকেইডে শুয়ে কিছুক্ষণ গড়াগড়ি না করলে মনে একটা খুঁতখুঁত থেকেই যেতো! সেই আফসোস রাখতে চাইনি।
সৌন্দর্যের দেশ বান্দরবানের আরেক বিস্ময় | বান্দরবান | বাংলাদেশ
বান্দরবান | বাংলাদেশ


সৌন্দর্যের দেশ বান্দরবানের আরেক বিস্ময় | বান্দরবান | বাংলাদেশ ফিরতে আমাদের প্রায় অনেক দেরী হয়ে গিয়েছিলো। ততক্ষণে সূর্য ডুবে গেছে। তবু আমাদের রাইডার হুস করে বাইকে টান মেরে ডিম পাহাড় দেখাতে নিয়ে গেলো আমাদের। সন্ধ্যা প্রায় হয়ে যাওয়ায় কুয়াশায় দূরের পাহাড় সব ঢেকে গিয়েছিল। তবে কুয়াশা মোড়ানো পাহাড় দেখতেও অসাধারণ লাগছিল। কয়েক মিনিট সেখানে থেকে ফেরার পথ ধরলাম। মনে মনে ঠিক করে নিলাম অনেক সময় নিয়ে আরেকবার আসবো ডিম পাহাড়ে সূর্যাস্ত দেখতে!
আর্মি চেকপোস্ট ছয়টায় বন্ধ হয়ে যায়। আমরা সেখানে পৌঁছলাম সাড়ে ছয়টারও পরে। তবে জেরা করেনি তেমন। জিজ্ঞেস করেছিলো দেরী করেছি কেন? উত্তর দেবার আগেই যাওয়ার অনুমতি মিলে গেলো। ব্যস আমরাও দেরী না করে সাঁই করে বাইকে চড়ে ফেরার পথে চলতে লাগলাম।
যাতায়াত - চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজারের বাসে চকরিয়া বাস টার্মিনাল। ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা বাসে করে যেতে পারলে সবচে ভালো হয়। নয়তো এস আলম কিংবা সৌদিয়া তে করে যাওয়া ভালো। এরপর চকরিয়া থেকে জীপে করে আলীকদম। কিংবা ঢাকা থেকে সরাসরি আলীকদমের বাস আছে। আলীকদম থেকে রিকশা/ইজিবাইকে পানবাজার। পানবাজার থেকে বাইকে করে আদু মুরং পাড়া। এক বাইকে দুজন যাওয়া যায়। যাওয়া আসা খরচ পড়বে জনপ্রতি চারশো টাকা। ডিম পাহাড় যেতে চাইলে কথা বলে ঠিক করে নিতে হবে।
সৌন্দর্যের দেশ বান্দরবানের আরেক বিস্ময় | বান্দরবান | বাংলাদেশ
বান্দরবান | বাংলাদেশ
আর্মি চেকপোস্টে জাতীয় পরিচয়পত্র কিংবা অন্য যেকোন ধরনের পরিচয়পত্রের ফটোকপি জমা দিতে হয়৷ যাওয়ার সময় সাথে করে নিয়ে যাবেন। আর যত সকালে আলীকদম যাওয়া যায় ততই ভালো৷ ঘোরার জন্য পর্যাপ্ত সময় মিলবে তাহলে৷ কেননা আর্মি চেকপোস্ট সন্ধ্যা ছয়টার মধ্যে বন্ধ করে দেয়া হয়৷ সাধ আর সাধ্যের মিল ঘটাতে পারলে আলীকদমে অন্তত একরাত থাকা উচিত। তাহলে স্বর্গীয় সব দৃশ্য স্বচক্ষে দেখতে পাবেন...নির্ঘাত! প্রকৃতি অপার বিস্ময় গায়ে মেখে অপেক্ষায় আছে - মানুষ তার রহস্য উন্মোচন করবে বলে !
সৌন্দর্যের দেশ বান্দরবানের আরেক বিস্ময় | বান্দরবান | বাংলাদেশ
বান্দরবান | বাংলাদেশ
পাহাড়িদের জীবনযাপন বেশ সাদাসিধে। তাদের ব্যবহারও যথেষ্ট আন্তরিক। তাদের সাথে ভালো ব্যবহার করুন। বৈচিত্রময় সংস্কৃতিকে শ্রদ্ধা করতে শিখুন৷ তা না হলেও অন্তত সহনশীল হতে শিখুন!
অপচনশীল দ্রব্য ফেলার জায়গা না পেলে পলিথিনে ভরে ব্যাগে করে নিয়ে আসুন। নির্দিষ্ট স্থানে ফেলুন। কিছুটা দায়িত্ব নিতে শিখুন। এমন ছোট ছোট সচেতন পদক্ষেপই দেশটাকে সুন্দর রাখতে সাহায্য করবে।
সৌন্দর্যের দেশ বান্দরবানের আরেক বিস্ময় | বান্দরবান | বাংলাদেশ
বান্দরবান | বাংলাদেশ

You Might Also Like

0 comments

Flickr Images